
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এতে আগামীতে খাদ্য উৎপাদনে অনিশ্চয়তার শঙ্কা করেছে বরেন্দ্র উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ)। এই অবস্থায় সদর উপজেলার ঝিলিম ইউনিয়ন, গোমস্তাপুর উপজেলার রাধানগর ও পার্বতীপুর ইউনিয়ন এবং নাচোল উপজেলায় ইরি ধান চাষে নিরুৎসাহিত করছে বিএমডিএ কর্তৃপক্ষ।
বিএমডিএ সূত্রে জানা যায়, বরেন্দ্র অঞ্চলে প্রতি বছর পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে এবং মাটির নিচে পানির পরিমাণ কমে যাচ্ছে। প্রতিবছর ইরি ধান আবাদ করতে ১৬ থেকে ১৮টি সেচ লাগে। অন্যদিকে গম চাষ করতে মাত্র ২ থেকে ৩টি সেচ লাগে। এ ছাড়া প্রতিবছর বৃষ্টির মাধ্যমে ভূগর্ভে পানি জমা হয় ৯০০ মিলিমিটারের মতো, অপরদিকে এই জেলায় ফসল চাষে পানি লাগে ১৩০০ মিলিমিটার। ফলে প্রতিবছর ৪০০ মিলিমিটার পানি ঘাটতি থাকে। এতে প্রতিনিয়ত বরেন্দ্র অঞ্চলের মাটির নিচের পানির তীব্র সংকট দেখা দিচ্ছে।

তাই এই অঞ্চলে ইরি ধান আবাদ না করলে পানির সংকট ধীরে ধীরে কেটে যাবে বলে আশা করছে বিএমডিএ কর্তৃপক্ষ। সেক্ষেত্রে তারা কৃষকদের ইরি ধান চাষাবাদে নিরুৎসাহিত করার জন্য কৃষকের মাঝে লিফলেট বিতরণ ও প্রতি স্কিমে ডিপ থেকে পানি দেওয়ার কর্মঘণ্টা বেঁধে দিয়েছেন।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আমন ধান ঘরে তোলার পর ইরি ধান চাষ করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তারা। কিন্তু এই বছর হঠাৎ করেই পানি দেওয়ার কর্মঘণ্টা বেঁধে দেওয়ার কারণে বিপাকে পড়েছেন তারা। এতে কৃষকদের মাঝে অসন্তোষ বিরাজ করলেও বাধ্য হয়েই অন্য ফসল উৎপাদনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা। কৃষকরা জানান, ইরি ধান চাষ করতে প্রতি স্কিমে প্রায় ২০০০ ঘণ্টা পানি লাগবে, কিন্তু বিএমডিএ থেকে এ বছর ৯৮০ ঘণ্টা পানি দেওয়া হবে। তাতে ইরি ধান চাষ করা সম্ভব নয়।
তাই এবার তারা সীমিত পরিমাণ জমিতে ইরি ধান চাষ করবেন আর অন্য জমিতে অন্যান্য ফসল চাষাবাদ করবেন। এ ছাড়া বিএমডিএ’র এ সিদ্ধান্তে চালের চরম সংকট দেখা দিতে পারে এবং চালের দামও বাড়তে পারে বলে মনে করেন কৃষকরা।
তবে চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে জানা যায়, বিএমডিএ’র উদ্যোগটি ভালো। তবে বিএমডিএ’র এই উদ্যোগ আরও আগে থেকে ধীরে ধীরে নেওয়া দরকার ছিল। এই মৌসুমে ইরি ধান চাষে কৃষকদের নিরুৎসাহিত করার বিষয়টি তিন থেকে চার মাস আগে জানালে তারা অন্য কোনো ফসল চাষের ব্যাপারে তাদের সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হতো।
চাঁপাইনববাগঞ্জ সদর উপজেলার ঝিলিম ইউনিয়নের কৃষক আব্দুর রহমান বলেন, আমরা বরেন্দ্র অঞ্চলে যে পরিমাণ জমি আবাদ করে আসছি, অফিস (বিএমডিএ) থেকে আদেশ করেছে সেই পরিমাণ জমি আবাদ করতে দেওয়া হবে না। যার কারণে আমরা ক্ষতিগ্রস্তের মধ্যে পড়ে গেছি। এ ছাড়া এর ফলে উৎপাদন হ্রাস হবে। এতে খাদ্য শস্যের বিশেষ সংকট দেখা দেবে। তাই পানির লেভেল কীভাবে বাড়তি করা যায় সে ব্যাপারে আমরা সরকারের কাছে আহ্বান জানাচ্ছি।
আরেক কৃষক রাসেল বলেন, অফিস (বিএমডিএ) থেকে শুনতে পাচ্ছি ডিপে (স্কিমে) জমি কম করে আবাদ করতে হবে। এতে আমরা আগে পাঁচ বিঘা জমি আবাদ করতাম এখন পাবো দুই বিঘার মতো। আর আবাদ কমে গেলে আমাদের কাজ কমে যাবে। তাতে আমাদের অসুবিধা হবে। এ ছাড়া ফসল উৎপাদন না হলে চালের উৎপাদন কমে যাবে এবং চালের সংকট দেখা দেবে বলে মনে করছি। দিন দিন পানির লেভেল বসে (নিচে নেমে) যাচ্ছে তাই সরকারের কাছে পানির লেভেল বাড়ানোর জন্য আবেদন করছি।
ডিপচালক শফিকুল ইসলাম বলেন, আমার স্কিমে ১৪০ বিঘা জমি আছে। তাতে গতবছর ১০০ বিঘার মতো বোরো (ইরি ধান) আবাদ করেছিলাম। এ বছর বিএমডিএ সময় মেপে দিয়েছে তাই মাত্র ২০ বিঘা জমিতে ধান চাষ করা হবে। এ ছাড়া আমরা ভাত বেশি খাই, গম কম খাই। তাই ধান আবাদ হলে কৃষকের জন্য ভালো। আর ধান চাষ না হলে মূল্য বেড়ে যাবে। এখনই অগ্রহায়ণ মাসে ১৪৫০ টাকা মণ ধান। বোরো আবাদ না হলে এই ধান ১৮০০ থেকে ২০০০ টাকা মতো হয়ে যাবে।